অস্ট্রিয়ায় বাংলা মায়ের সূর্য সন্তান মাহমুদুর রহমান নয়ন

0
3

নুরুল আমিন

আমরা বাঙালি। গর্বিত এক জাতি। বিশ্বের বুকে বাঙালি জাতিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে বাংলা মায়ের সূর্য সন্তানেরা যুগে যুগে দেশ-বিদেশের মাটিতে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছে। তারুণ্যের আলো ছড়িয়ে বাংলার  ইতিহাস-ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে। বাংলার দামাল ছেলেরা দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলা মায়ের এক সুর্য সন্তান মাহমুদুর রহমান নয়ন বিদেশের মাটিতে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে। গড়ে তুলেছে নতুন এক ইতিহাস। উন্মোচন করেছে সম্ভাবনাময় নতুন এক দিগন্তের। ছড়িয়েছে নতুন আশার আলো।
ইউরোপ মহাদেশের দেশ অস্ট্রিয়াতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নয়ন তার আন্তরিকতা, সেবা, শ্রম, সততা, দক্ষতা ও ভালবাসা দিয়ে যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, তা সত্যি গৌরবের। বাঙালি যুবক নয়নের প্রতি অস্ট্রিয়ার মানুষ ব্যালটের মাধ্যমে ভালবাসার প্রতিদান দিয়েছে। ২০২০ সালের ১১ অক্টোবর অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা শহরে সে দেশের বিরোধী দল পিপলস পার্টি থেকে ভোটে অংশ নিয়ে কাউন্সিলর পদে মাহমুদুর রহমান নয়ন বিজয় লাভ করে।
ভোলা লালমোহনের বরেণ্য সাংবাদিক অল ইউরোপিয়ান প্রেসক্লাবের উপদেষ্টা, অস্ট্রিয়া-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সভাপতি, আন্তর্জাতিক বাংলা অনলাইন দৈনিক ইউরো সমাচার পত্রিকার সম্পাদক, বিশিষ্ট সমাজ সেবক, কীর্তিমান পুরুষ ও মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রহমানের সুযোগ্য সন্তান মাহমুদুর রহমান নয়নের এই কৃতিত্বে অস্ট্রিয়ায় বসবাসরত প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে অপার আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। আনন্দে মেতে ওঠে নয়নের শৈশব স্মৃতি বিজড়িত লালমোহনের সংবাদ ও সাংস্কৃতিক কর্মীসহ অন্যান্য সবাই। দ্বীপ জেলা ভোলার লালমোহন পৌরসভার লঞ্চঘাট এলাকার ঐতিহ্যবাহী লাভলী ম্যানসনে কেটেছে নয়নের শৈশব। ১৯৮৪ সালে সাংবাদিক মাহবুবুর রহমান স্বপরিবারে ভিয়েনায় যান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিস্টে অনার্স করেন। ভিয়েনায় তিনি ঢাকার বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে সাংবাদিকতা শুরু করেন। বিদেশে থেকেও তিনি দেশের জন্য কাজ করেন। দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য তিনি সবসময় অস্ট্রিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাঙালিদের উৎসাহ দেন, তাদের সহযোগিতা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন।
ভিয়েনায় ১৯৯৫ইং সালে নয়নের জন্ম হয়। নয়নের জন্মের এক বছর পর নাড়িরটানে নয়নের বাবা স্বপরিবারে দেশে ফিরে আসেন। এখানে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাংবাদিক সংগঠনেের সাথে যুক্ত হয়ে তিনি সমাজের কল্যাণ, গরীব-দুঃস্থ ও দুর্গত মানুষের সেবা করতে থাকেন। বেকারদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেন। লালমোহনে একটি কিন্ডারগার্টেনে নয়নের প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয়। এরপর লালমোহন সরকারি মডেল হাই স্কুল সংলগ্ন প্রাইমারি স্কুলে নয়ন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে। এরপর আবার তিনি পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভিয়েনায় পাড়ি জমান। ভিয়েনা শহরের নামকরা একটি হাই স্কুলে নয়নকে ভর্তি করা হয়। নতুন কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় নয়ন। নতুন ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে নয়ন পথ চলতে শুরু করে। অস্ট্রিয়ার লেখাপড়া হয় জার্মান ভাষায়। কিন্তু এই ভাষা তার জানা নেই। তার বুকে একটা বল ছিল আমরা বাঙালি। অসম্ভবকে সম্ভব করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। নয়নের বাবা মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক মাহবুবুর রহমান ও মা আদর্শ গৃহিণী দৌলতুন্নেসা রহমান সবসময় নয়নকে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সাহস যোগাতো। নয়ন ক্লাসের পড়ার পাশাপাশি জার্মান ভাষা শেখার জন্য দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যে স্কুলে নয়নের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। স্কুলের সকল শিক্ষক ও সহপাঠী বন্ধুরা বলতে লাগলো, নয়ন তোর মাথাটা বড্ড ভালোরে। তুই একদিন অনেক বড় হইবি। যেই কথা সেই কাজ। স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষায় নয়ন প্রথম স্থান পেয়েছে। স্কুলের ডিরেক্টর তাকে সংবর্ধনা দেন এবং মডেল হিসেবে ঘোষণা করেন। শিক্ষক ও সহপাঠী বন্ধুসহ সকলের ভালবাসায় নয়ন মুগ্ধ হয়েছে। সকলের মুখে মুখে প্রশংসায় প্রিয় একটি নাম তুখোড় মেধাবী বাঙালি তরুণ নয়ন। বিদেশের মাটিতে নয়নের বেড়ে ওঠার পেছনে তার মায়ের ভূমিকা অপরিসীম। কারণ ব্যস্ততার কারণে তার বাবা তাকে বেশি সময় দিতে পারতেন না। মা-বাবার পাশাপাশি তার বড় বোনেরাও তাকে খুব উৎসাহ ও সাহস দিতো।
এক ক্লাস দুই ক্লাস করে নয়ন হাইস্কুল পাস করলো। স্কুলে যেদিন নয়নের পরীক্ষার রেজাল্ট বের হলো, সেদিন অপার আনন্দের অমিয় সুধায় জেগে অশ্রুসিক্ত নয়নে নয়ন বলেছিল, আমি বাংলা মায়ের সন্তান। আমার বাবা কৈশোরে পা রেখে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছে। আমি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। আমি সোনার বাংলার সন্তান। আমরা বীর বাঙালি। বাধার প্রাচীর ভেঙে এগিয়ে যাবো দূর দিগন্তে সোনালি সূর্যের সন্ধানে। নয়নের কান্না দেখে তার মা, বাবা ও বড় তিন বোন অঝোরে কেঁদেছে। নয়নের বড় বোন ফারজানা রহমান লাভলী তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্না জড়িত কণ্ঠে বললো, তুই আমাদের বুকের ধন। তোকে নিয়ে আমরা অনেক স্বপ্ন দেখি। বাবা দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা। তুই দেশ ও জাতির মুখ উজ্জ্বল করবি। তুই আমাদের স্বপ্ন পূরণ করবি। অনেক বড় হইবি। তার ২য় বড় বোন আফসানা রহমান ডেইজি কান্নাভেজা কণ্ঠে বললো, তুই আমাদের আদরের ভাই। নয়ন মনি। তোকে নিয়ে আমরা স্বপ্ন দেখছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধা বাবার আদর্শকে তুই বাঁচিয়ে রাখবি। স্বপ্ন পূরণ করবি। আবেগ আপ্লূত কান্নায় ভেঙে পড়ে তার ৩য় বোন রোকসানা রহমান শিউলি বললো, তোর ভেতর যে আশার আলো দেখছি, তুই একদিন অনেক বড় হইবি। দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনবি। তোর জন্য দোয়া রইল। আশীর্বাদ পূর্ণ ও আবেগঘন এই মূহুর্ত নয়নের পথচলার পাথেয় হয়ে ওঠে। অনেক বড় হওয়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে মা, বাবা ও বোনদের অনুপ্রেরণায় নয়ন এগিয়ে যেতে থাকে।
হাই স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য নয়ন ভর্তি হলো ভিয়েনা শহরের নামকরা একটি হায়ার টেকনিক্যাল কলেজে। এখানেই রচিত হয় নয়নের জীবনের নতুন অধ্যা। কলেজের নানা সমস্যা নিয়ে নয়ন কথা বলতে শুরু করে। কলেজের নিয়ম-কানুন পরিবর্তন করে শিক্ষার্থীদের সুবিধাজনক দিক বিবেচনায় আনার দাবি তোলে নয়ন। কলেজে সকলের কাছে নয়ন হয়ে ওঠে প্রতিবাদী একটি নাম। তরুণদের নেতৃত্বে চলে আসে নয়ন।
অল্প সময়ের ব্যবধানে কলেজে নয়নের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। পর পর দুইবার নয়ন ঐ কলেজের ছাত্র সংসদের সভাপতি নির্বাচিত হয়। এরপর আর তাকে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। কলেজের উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের নানা বিষয়ে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে এক সময় নয়ন অষ্ট্রিয়ার কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়। ঐ কলেজের ফাইনাল পরীক্ষায় সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অস্ট্রিয়ান গ্রেড অনুযায়ী এক্সিলেন্ট রেজাল্ট করে। এতে তরুণদের মাঝে তার কদর বেড়ে যায়। অতৃপ্ত বাসনা বুকে নিয়ে নয়ন এগিয়ে চলে জীবন গড়ার সিঁড়ি বেয়ে।
উচ্চ শিক্ষা অর্জনের জন্য নয়ন ব্রিটেনের সেন্ট্রাল ল্যাঙ্কাশায়ার  বিশ্ববিদ্যালয়ে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হয়। ব্রিটেনে থাকলেও অস্ট্রিয়ান পিপলস পার্টির যুব ইউনিটের সাথে তার সম্পৃক্ততা ছিল বেশ জোরাল। নয়ন বিএসসি অনার্সে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসিতে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ম্যানেজমেন্টে ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে পাশ করে। এরপর ভিয়েনায় এসে জার্মানির একটি খ্যাতনামা আইটি কোম্পানিতে চাকরি নেয়। এসময় নয়ন অস্ট্রিয়ান রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। নয়ন রাজনীতিতে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে থাকে। তরুণ সমাজ রাজনীতিতে এলে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে, সমাজ দুর্নীতি মুক্ত হবে এবং দেশ ভালো চলবে নয়ন তার এই ধারণা বুঝাতে সক্ষম হয়েছে। তরুণদের মাঝে আরও রাজনৈতিক ধারণা বৃদ্ধি করতে তরুণ এই রাজনীতিবিদ বিভিন্ন রাজনৈতিক কেম্পেইনে অংশ গ্রহণ করে এবং রাজনীতিতে তরুণদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানায়। বাঙালি তরুণ রাজনীতিবিদ মাহবুবুর রহমান নয়ন অস্ট্রিয়ান তরুণদের প্রিয়জন হয়ে ওঠে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা বাঙালি তরুণদের নিয়ে মাহমুদুর রহমান নয়নের ধারণা, প্রবাসে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি তরুণরা নিজেদের কমিউনিটিতে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়া জরুরী। এতে বিশ্বে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির সম্মান বাড়বে।
বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে তরুণ রাজনীতিবিদ নয়নের অভিমত, বাংলাদেশের গতানুগতিক রাজনীতির আমুল পরিবর্তন আনতে হবে। বড় বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে তরুণদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। নুতন ব্যবসা এবং চাকরির ক্ষেত্রে তরুণদের সুযোগ দিতে হবে। তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়াও পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। রাজনীতিতে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হবে, তবেই বাংলাদেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। আমি মনেপ্রাণে বাঙালি। বাংলাদেশের সাফল্য কামনা করি।
অস্ট্রিয়ান পিপলস পার্টির অন্যতম নেতা তরুণ প্রজন্মের আশার আলো ও স্বপ্নসারথি মাহমুদুর রহমান নয়ন। অস্ট্রিয়ান রাজনীতিতে নয়ন এক অবিসংবাদিত নেতা ও কিংবদন্তির এক নাম। তারুণ্যের আইকন নয়ন অধিকার বঞ্চিত মানুষের পক্ষে সোচ্চার হয়ে ওঠে এবং অধিকার আদায়ের জন্য ভূমিকা রাখে। তরুণ প্রজন্মকে দ্বীপ্তিময় আলোর পথে এগিয়ে নিতে তার অবদান অবিস্মরণীয়। সুদূর প্রবাসে অস্ট্রিয়ার মতো উন্নত দেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে বাঙালি তরুণের দৃপ্ত পদচ্ছাপ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব সত্যি আনন্দের বিষয়। নয়ন আমাদের গৌরব। আমাদের অহংকার। নয়নের আলোয় আলোকিত হোক অস্ট্রিয়াবাসি ও অস্ট্রিয়ার প্রবাসী বাঙালি, সারা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ুক নয়নের আলো। অস্ট্রিয়ার বাঙালি তরুণ রাজনীতিবিদ নয়ন হোক আমাদের আলোর দিশারী, উৎসাহ-উদ্দীপনার ফসল ও প্রেরণার উৎস। রাজনীতির শীর্ষচূড়ায় আরোহন করুক এটাই প্রত্যাশা। মাহবুবুর রহমান নয়ন বাংলার কৃতি সন্তান, বাংলা মায়ের সূর্য সন্তান। সফলতার সুবাতাসে ভরে উঠুক তার জীবন।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট, লালমোহন, ভোলা। nurulamin911@gmail.com.

SHARE

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here