করোনার থাবায় অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে বাংলাদেশের ১০ কোটি মানুষ

0
7

রিপন শান

গ্রামবাংলার একটি প্রচলিত প্রবাদ- ” রসিক শুধু শীতেই মরে না, ভাতেও মরে ।” করোনা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মানুষের হচ্ছে সেই দশা । শুধু সংক্রমণ আর প্রাণহানিতে সীমাবদ্ধ নেই করোনা মহামারী । করোনাভাইরাসের করাল থাবায় অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের ১০ কোটি মানুষ। চলমান করোনা দুর্যোগে বাংলাদেশের ১০ কোটি ২২ লাখ মানুষের আয় কমে গেছে৷ আর পরিবার হিসেবে আয় কমেছে শতকরা ৭৪ ভাগ পরিবারের৷ এক যৌথ সমীক্ষায় করোনাকালে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার এই চিত্র পাওয়া গেছে৷ ব্র্যাক, ডেটা সেন্স এবং উন্নয়ন সমন্বয় এর সমীক্ষায় আইএমএফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষা এবং গবেষণা ব্যবহারের পাশাপাশি একটি জরিপও করা হয়৷ গত ১৫-১৮ এপ্রিলের সময়ের মধ্যে দেশের ২৫টি জেলার ৯৬২ জনের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট প্রশ্নমালার ভিত্তিতে তথ্য নেয়া হয়৷ আর তাদের বাছাই করা হয় দৈব চয়নের ভিত্তিতে৷ এখন প্রধান কাজ হলো আয় যাতে না কমে তার ব্যবস্থা করা৷ আর সেটা না করা গেলে দারিদ্র্য আরো বাড়বে৷
“কোভিড ১৯ ও জাতীয় বাজেট ২০২০-২০২১: নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কৌশল পুনর্বিবেচনা”
শিরোনামে এই সমীক্ষায় বলা হয়েছে ১৪ লাখেরও বেশি প্রবাসী এই করোনার সময় চাকরি হারিয়েছেন ৷ তাদের একটি অংশ এরইমধ্যে দেশে ফিরেছেন৷ বাকিরা ফেরার অপেক্ষায়৷ সমীক্ষায় বলা হয়েছে, করোনায় অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে থাকা ১০ কোটিরও বেশি মানুষের মধ্যে পাঁচ কোটি ৩৬ লাখ মানুষ চরম দরিদ্র অবস্থার মধ্যে আছেন৷ যাদের এখন দৈনিক আয় দুই ডলারের কম৷ তাদের মধ্যে চার কোটি ৭৩ লাখ উচ্চ অর্থনৈতিক ঝুঁকি এবং তিন কোটি ৬৩ লাখ মানুষ উচ্চ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন৷
যেসব পরিবার থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে তাদের মধ্যে কমপক্ষে ৩৪.৮ শতাংশ পরিবার থেকে কমপক্ষে একজন সদস্য চাকরি হারিয়েছেন৷ গত মার্চ থেকে মে মাসে তাদের পারিবারিক উপার্জন ৭৪ ভাগ কমে গেছে৷
এই সময়ে পোশাক খাতে বড় ধাক্কা লেগেছে৷ তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি ২০১৯-এর এপ্রিলের তুলনায় চলতি বছরের এপ্রিলে ৮৪ শতাংশ কমেছে৷ গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে ৭ এপ্রিলের মধ্যে এক হাজার ১১৬টি কারখানা কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে৷ ২২ লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন৷ সমীক্ষায় দেখা যায়, করোনাকালে অনলাইন বা ডিজিটাল শিক্ষায় অংশ নেয়া অনেক শিক্ষার্থীর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না৷ কারণ দেশে মাত্র ৩৪ শতাংশ পরিবারের স্মার্টফোন আছে৷ টিভি দেখার সুযোগ আছে ৫৪ শতাংশ পরিবারের৷ এর বাইরের শিশুরা ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচালিত শিক্ষা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে৷ সার্বিকভাবে এই করোনায় অর্থনৈতিক এবং সাস্থ্য ঝুঁকিতে আছেন নিম্ন আয়ের মানুষ৷তাদের পরিবারের উপার্জনশীল সদস্যের মৃত্যু হলে নারী ও শিশুদের মধ্যে অনাহার এবং অপুষ্টির শিকার হওয়ার উচ্চ আশঙ্কা সৃষ্টি হবে৷
দেশের ভিতরে যে লকডাউন পরিস্থিতি চলছে তার কারণেও বিভিন্ন শিল্প কারখানা ও সেবাখাতগুলোর কার্যক্রম প্রায় বন্ধ৷ এসব প্রতিষ্ঠানে যারা চাকুরি করছেন, যেসব ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা রয়েছেন তাদের কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকছে৷ এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক চীনে করোনার প্রকোপ শুরুর পর বলেছিল, দেশের প্রায় ৯লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাতে পারে৷ তবে এখন তৈরি পোশাক খাতেই অনেক শ্রমিকের চাকুরি হারানোর শঙ্কা রয়েছে৷ সমীক্ষায় আরো বলা হয়, দরিদ্র ও অতিদরিদ্রদের জন্য সরকারের দেয়া খাদ্য এবং নগদ সহায়তা সঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে না৷
তাদের মতে, কোভিড-১৯ নতুন অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং ডিজিটাল বিভাজন তৈরি করেছে৷
এই সমীক্ষার সাথে সরাসরি জড়িত ব্র্যাকের সিনিয়র পরিচালক কে এ এম মোর্শেদ বলেন, ‘‘এই জরিপটি এপ্রিলের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে৷ আমাদের আরো কয়েকটি সমীক্ষার কাজ চলছে৷ আমরা করোনায় কৃষক এবং সার্বিক অর্থনীতি নিয়ে আরো দুইটি সমীক্ষার কাজ সর্বশেষ তথ্য দিয়ে করছি৷ রোহিঙ্গা শরনার্থীদের নিয়ে সমীক্ষা করা হচেছ৷ তাতে দেখা যাচ্ছে এখনকার পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে৷’’ তিনি জানান, ‘‘এখন গ্রামের দারিদ্র্য পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে৷ শুরুতে তারা বিপর্যস্ত বেশি ছিলো৷ বোরো ধান উঠে যাওয়ায় তারা কিছুটা সামলে উঠেছে৷ কিন্তু শহরের পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে৷ কারণ এখানে ইনফর্মাল সেক্টরের সাথে জড়িত মানুষগুলো এখনো কাজে ফিরতে পারেনি৷’’
তিনি জানান, সরাসরি মানুষের কাছ থেকে স্যাম্পেলিং ছাড়াও নানা অর্থনৈতিক জরিপের তথ্য তারা এসব সমীক্ষায় ব্যবহার করছেন৷ এনিয়ে তাদের মোট দুইটি সমীক্ষা প্রকাশ করা হয়েছে৷ তিনি বলেন, ‘‘ধান চালের বাইরে কৃষক শব্জি উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে৷ পোলট্রিও ধকল কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে৷ তবে সমস্যা হচ্ছে সাপ্লাই চেইনে৷ সেটার উন্নতি হলে পরিস্থিতি আরো ভালো হবে৷ আর শহরে তো দোকান পাট খুললেও মানুষ সেখানে তেমন যাচ্ছেনা৷ হোটেল রোস্তোরা খুললেও সেখানে গ্রাহক নেই৷ ফলে শহরে এইসব সেক্টর নির্ভর মানুষগুলোর অবস্থা আরো খারাপ হচ্ছে৷’’
বিআইডিএস-এর অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ মনে করেন, এই সমীক্ষায় বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন ঘটেছে৷ শতকরা ৭৪ ভাগ না ৭০ ভাগ সেটা নিয়ে কথা হতে পারে৷ কিন্তু তাতে বাস্তব অবস্থার হের ফের হবেনা৷ তার মতে, ‘‘এখন মানুষের আয় যাতে আর না কমে সেই দিকে প্রথম নজর দেয়া প্রয়োজন৷ বাড়ানোর পরিকল্পনা পরে করা  যাবে৷ আর তা করতে হলে কোভিড সংক্রমণের আশঙ্কা যেসব সেক্টরে কম সেখানে জোর দিতে হবে৷ এখন অনলাইন বাণিজ্যের প্রসার হচ্ছে৷ সেখানে সরবরাহ ও হ্যান্ডেলিং-এ লোকজনকে কাজে লাগাতে হবে৷ পরিস্থিতি মোকাবেলা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়৷ ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, বিত্তবান সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে৷ কিন্তু আমরা সেটা দেখছি না৷’’
চাকরি হারানো প্রবাসী ও তার পরিবারের সদস্যেরা অনেক বিপদের মধ্যে আছেন বলে জানান কে এ এম মোর্শেদ৷ যারা ফিরে এসেছেন তারা সামাজিক নিন্দার শিকার হয়েছেন৷ বলা হয়েছে তাদের মাধ্যমেই করোনা ছড়িয়েছে৷ তারা ত্রাণও পাচ্ছেন না৷ আবার সরকার যে ২০০ কোটি টাকা ঋণের কথা বলেছে তাও পরিকল্পিত নয় বলে জানান মোর্শেদ  ৷
SHARE

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here