গলাচিপায় দখলবাজদের মামলায় হয়রানীর শিকার সাধারন কৃষক

0
2

দ্বীপকন্ঠ নিউজ ডেস্কঃ

পটুয়াখালীর গলাচিপার চরাঞ্চলে খাস জমি দখলকে কেন্দ্র করে ১২টি মামলা পাল্টা মামলায় সরকারি ও সাধারণ কৃষকসহ চারশতাধিক ব্যক্তিকে আসামী করা হয়েছে। এঘটনা শুধুমাত্র একটি চরেই। প্রকৃত পক্ষে গলাচিপার বিভিন্ন চলাঞ্চলে এ মামলা ও আসামীর সংখ্যা অন্তত পাঁচগুন হবে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন। চরের খাসজমির ধান কাটা নিয়ে খুন হয়েছে এক কৃষক। ফলে এসব এলাকার চাষীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

বিভিন্ন এলাকার ভূক্তভোগী ও পুলিশ সূত্রে এসব তথ্য জানাগেছে। গলাচিপার চরবিশ্বাসের চরওহাবের ভূমিহীন কৃষক আবুল কাসেম ফকির (৬৫) জানান, ধান কাটা মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপজেলার চরাঞ্চল অশান্ত হয়ে উঠেছে। চাষীদের শুধু ধান নয়। যে কোন ফসলের সময়ই জোদদার লাঠিয়াল বাহিনী তা-ব চালায়। এতে ভূমিহীন চাষীদের মাঝে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিবছর ফসলের মৌসুম গলাচিপা উপজেলার চরবাংলা, চরকাজল, চর বিশ্বাস, গোলখালী, আমখোলা, দড়ি বাহেরচরসহ বিভিন্ন এলাকায় জোদদারদের লাঠিয়াল বাহিনীর মহড়ায় শান্ত চরাঞ্চল অশান্ত হয়ে উঠছে।

ধান কাটা নিয়ে চরাঞ্চলে সহিংসতা নতুন কোন ঘটনা নয়। জমি দখলকে কেন্দ্র করে এ বছর চরকাজলের চরশিবা গ্রামে লাঠিয়াল জোদদারদের প্রভাবে ভিটে ছাড়ার উপক্রম হয়েছে ফারুক খানসহ দুই পরিবারের।

জমির কাগজ পত্র সঠিক থাকলেও প্রতিনিয়ত হামলা-হুমকিতে আতঙ্কে রয়েছেন তারা। গত আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে কালাম মাঝি ও নাজিমের নেতৃত্বে হামলা চালায় ফারুক খানের বাড়িতে।

এ ঘটনায় ফারুক খান বাদি হয়ে গত ১৯ আগস্ট আবদুল হক কালাম মাঝি, মো. নাজিম ও আব্দুল লতিফ খানকে প্রধান আসামী করে ১৮ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা দায়ের করেন।

এ মামলায় পুলিশ ইতিমধ্যে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোর্টে চার্জশিটও জমা দিয়েছে। কিন্তু এর পরেও আতঙ্ক কাটেনি ফারুক খানের। ফারুক খান বলেন, পুলিশ চার্জশিট জমা দেওয়ার আগেই কালাম মাঝিরা আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাজানো মামলা দায়ের করেছে।

আইনীভাবে না পেরে আমাদেরকে একের পর এক বিভিন্ন মিথ্যা হয়রানিমূলক মামলায় জড়াতে চাচ্ছে। অথচ আদালতে সবগুলো মামলাই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

খাস জমি নিয়ে বিরোধ সম্পর্কে গলাচিপা-চরফ্যাশন উপজেলার সীমানা বিরোধীয় চরওহাবের জমি উদ্ধার বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য মো. মিজানুর রহমান জানান, গলাচিপার চরবিশ্বাসের চরওহাবের জমি নিয়ে দীর্ঘ চারদশক ধরে বিরোধ চলে আসছে।

গলাচিপার কৃষকদের এসএ ও সিএস ম্যাপ ও যথাযথ কাগজপত্র থাকলেও তা মানতে চায়না ভূমি দস্যুরা। চরওহাবে গলাচিপার অংশের ভূমি একটি জোদদার চক্র নিজেরা একটি পর্চা ম্যাপ করে ভূমি দখলের পায়তারা করে আসছে। আর এ নিয়েই বিরোধ শুরু হয়।

এ বিরোধকে কেন্দ্র করে এ বছর গত ২১ অক্টোবর কৃষকদের কাচা ধান জোর করে কেটে নিয়ে যাচ্ছিল চরফ্যাশনের জোদদার চক্র। এতে বাধা দিলে সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়।

এতে ওই সময় কমপক্ষে ১৮জন ভূমিহীন কৃষককে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে। এর মধ্যে কৃষক কাসেম মৃধার মৃত্যু হয়। এর পরেও থেমে নেই জোদদাররা।

বিভিন্ন ভাবে ভূমি দখলের পায়তারা করে আসছে। এ ছাড়াও চরের ধান কাটা নিয়ে ১৯৯৬ সালে গলাচিপা উপজেলার (বর্তমান রাঙ্গাবালী উপজেলা) চরলতায় সংঘটিত হয়েছিল পটুয়াখালী জেলার সর্বকালের নৃশংসতম ঘটনা। এসময় ব্যাপক রক্তপাত, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, অগ্নিসংযোগ, খুন, গুম, ধর্ষণ, অপহরণ ও লুটপাটসহ লাঠিয়ালরা নারকীয় তা-বলীলা চালায়। ভূমিহীনদের ৫শ’ ৩১টি ঘরে অগ্নি সংযোগ কর সম্পূর্ণ ভষ্মিভূত করে দেয়।

অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা য়ায় এক কৃষক। আহত হয় কয়েশ’ ভূমিহীন নারী-পুরুষ ও শিশু-কিশোর। তিনি আরো জানান, চরের খাস জমির মালিকানা প্রশ্নে দাবিদারের সংখ্যা অনেক।

কেউ দাখিলার সূত্রে, কেউ ভূয়া কাগজপত্রের সূত্রে আবার কেউ দখলী সূত্রে। তবে চরাঞ্চলে জমির মালিকানা হিসবে ‘জোর যার মূল্লুক তার’ সংখ্যাই বেশি। মিজানুর আরো জানান, গত ২০১৯ সালে চরফ্যাশন এলাকার জনৈক আলী আহম্ম্দ পটুয়াখালী ও ভোলা জেলা প্রশাসক, পটুয়াখালী ও ভোলা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), পটুয়াখালী জেলা পুলিশ সুপার, গলাচিপা ও চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী অফিসার, গলাচিপা ও চরফ্যাশন সহকারী কমিশনার (ভূমি), গলাচিপা অফিসার ইনচার্জ গলাচিপা, ভূমি অফিসের সার্ভোয়ার, চরবিশ্বাস ইউপি চেয়ারম্যানসহ মোট ১২জনকে আসামী মামলা দায়ের করে।

এ মামলা ভোলার চরফ্যাশনের যুগ্ম জেলা জজ আদালতে চলমান। এ ছাড়াও শুধুমাত্র চরওহাবে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি ১২ মামলা চলমান। এতে কমপক্ষে ২০০ শতাধিক আসামী রয়েছে।

ধানকাটা নিয়ে বিরোধ সম্পর্কে গলাচিপা থানার অফিসার ইনচার্জ মো. মনিরুল বলেন, ‘আপাতত বড় কোন সমস্যা নেই। তবে যেসকল এলাকায় ধানকাটা নিয়ে বিরোধ রয়েছে ওই সকল এলাকায় পুলিশের বিশেষ টিম টহল দিচ্ছে। আমরা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছি।’

এ বিষয় গলাচিপা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বলেন, ‘গলাচিপা উপজেলায় মোট খাস জমির পরিমাণ ৪০ হাজার একরেরও বেশি। এর মধ্যে বন্দোবস্ত ছাড়া এখনো প্রায় সাড়ে ৫ হাজার একর ভূমি রয়েছে। সাড়ে ৫ হাজার একরের মধ্যে প্রায় ৩০০ একর জমি বেদখল রয়েছে। এছাড়াও সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে যে মামলা হয়েছে তা আইনীভাবে নিষ্পত্তি করা হবে।

SHARE

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here