জীবন জেগে থাকে

0
2

নুরুল আমিন

জীবন থেকে নিঃস্ব হাতে ফিরে যাবার আগে মানুষ কত স্বপ্ন দেখে। জীবনের বিস্তীর্ণ মাঠে কত রকমের রঙিন স্বপ্নের প্রজাপতি উড়ে। স্বপ্ন দেখতে বাধা নেই। মানুষের বাগানে মানুষ বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে বেঁচে থাকার স্বপ্নে মানুষ বিভোর হয়ে ওঠে। কিছু স্বপ্নের ফুল ফোটে। আর কিছু স্বপ্নের কলি মুকুলেই ঝরে যায়। তবুও মানুষ নিরাশ হয় না। অনন্ত অসীম বাসনায় জীবন জেগে থাকে।
জীবন চলার পথ কখনও মসৃণ নয়। জীবন কখনও ফুল শয্যা নয়। আশার কলি থেকে যতগুলো ফুল ফোটে, হতাশা-ব্যর্থতার নীল তরঙ্গে মিশে দূর অজানায় ততোধিক ভেসে যায়। নিরাশার আঁধার ঘিরে ধরে। অলস দুপুর, ক্লান্ত বিকেল, সন্ধ্যার আবছা আবছা অন্ধকার এবং এরপর নেমে আসে তিমির কালো রাত। নিঝুম নিস্তব্ধ প্রহরে চাঁদ-তারার হাসি দেখে মানুষ মুগ্ধ হয়। মনের ক্লান্তি দূর করে। আরামে ঘুমায়। নিরাশার আঁধার ভেঙে জীবন জেগে থাকে। আঁধার রাতের শেষে সোনালি সূর্যের আলোয় ভরে ওঠে সকাল। মনের মাধুরী মিশিয়ে জীবনের স্বাদ পেতে চায় মানুষ। জীবনটা ছোট। কিন্তু জীবনের গল্প ছোট নয়। জীবনের গল্প অনেক বড়। তবে অল্প অল্প করে জীবনের গল্প ফুরিয়ে যায়। জীবনের সব রঙ নিভে গেলে একসময় পাণ্ডুলিপি আয়োজন করে। তখন পাণ্ডুলিপির বিবর্ণ পাতায় জীবন জেগে থাকে। সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে অনন্ত সুখস্বপ্নে বিভোর হয়ে জীবন জেগে থাকে।
পৃথিবীতে মানুষের ক্ষণজন্মা জীবন। এখানে কেউ চিরকাল বেঁচে থাকে না। তবুও ক্ষণজন্মা মানুষ অনন্তকাল বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে অবিরাম। যারা অনন্তকাল বেঁচে থাকার স্বপ্নে সফল হয়, তারা হচ্ছে মহৎপ্রাণ। মহৎ ব্যক্তি মহৎকর্মের মধ্য দিয়ে ধরনীর বুকে অনন্তকাল বেঁচে থাকে। যুগ যুগ ধরে মানুষ মহৎ ব্যক্তিদের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় স্মরণ করে এবং তাদের অনুসরণ করে। মানুষের ভক্তি ও ভালবাসা মিশ্রিত দুর্বলতার মাঝে জীবন্ত হয়ে মহৎ ব্যক্তিদের জীবন জেগে থাকে।
সঙ্গী-সাথী হারানোর বেদনায় কাতর হয়ে তীর্থের কাকের মতো জেগে থাকে কত জীবন। প্রেম-বিরহের মালা গেঁথে কত নিশি ভোর হয়। পুরনো অতীতে মিশে দূর অজানায় ভেসে কিছু জীবন জেগে থাকে। অনন্ত প্রেম জেগে ওঠে বুকে। আঁধার ঠেলে ঠেলে এগিয়ে চলে দুরন্ত বাসনায়। সোনালি সূর্যের সন্ধানে। দুঃখ-কষ্টে যাদের জীবন গড়া, তারাও বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে এবং বেঁচে থাকে। সুখপাখির সন্ধানে নিরন্তর ছুটে চলে। ফুল ফোটে, সৌরভ ছড়ায়, আবার ঝরে যায়। মানুষ প্রকৃতির ছকে বাঁধা এই নিয়মের বাইরে নয়। মানুষ মরে যায়, কিন্তু স্মৃতি থেকে যায়। স্মৃতির করিডোরে জীবন জেগে থাকে।
কর্ম ও আদর্শের মধ্যে মানুষ বেঁচে থাকে। সৎকর্ম মানুষকে অমর করে রাখে। জীবনের সব চাওয়া-পাওয়ার উর্ধ্বে ওঠে যারা নিবেদিত প্রাণে দেশ ও দেশের মানুষকে ভালবাসে তারা অমর হয়। যারা অবহেলিত, বঞ্চিত, নির্যাতিত, অসহায় ও গরীব-দুখী মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে নিজেকে বিলিয়ে দেয়, সেই সব মহান ব্যক্তিদের জীবন জেগে থাকে মানুষের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসার মাঝে।
কবি-সাহিত্যিকরা অনন্ত সুধায় অনন্তকাল জেগে থাকে বই পোকাদের ভীড়ে, বেণুকার সুরে, অন্তরে অন্তরে। চাঁদ জেগে থাকে গগনে, নদী জেগে থাকে ঢেউয়ের গর্জনে, জোনাকি জেগে থাকে বাগানে আর লেখক জেগে থাকে পাঠকের গভীর মনের বিজন কোণে। আমি প্রায় সময়ই রাত জেগে লেখালেখি করি। প্রাণের নির্জনতায় কত রাত নির্ঘুম চলে গেলো! চোখের তলায় কখন যে কৃষ্ণ গহবর হয়ে গেলো! মালুম করতে পারিনি। শুধু এইটুকু ভেবে তৃপ্তি পাই, শতাব্দী পরে হলেও আমার এই লেখা কোন পাঠক পড়বে, মনের তৃষ্ণা মেটাবে, আমাকে স্মরণ করবে এবং আমার জন্য দোয়া করবে। ওখানেই আমার জেগে থাকা, ওখানেই আমার বেঁচে থাকা। একাল-সেকালের মধ্যে নিবিড় সখ্যতা আর সেতু বন্ধন তৈরির মধ্যে আমার জীবন জেগে থাকে।
কত মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করে। অসহায় কত মানুষ যাযাবরের মতো ভাসমান দিন কাটায়। বেকারত্বের অভিশাপে অসহায় হয়ে পড়ে কত তারুণ্য। কত মানুষ অর্ধাহারে-অনাহারে দিনযাপন করে। সারারাত জেগে কত মানুষ কত কষ্টে শ্রমের কাজ করে। দিনেও ঠিকমত ঘুমাতে পারে না। বস্তিতে বসবাস করা কিংবা গার্মেন্টস কর্মীদের বা কৃষকদের দিকে তাকালে বোঝা যায়, মানুষ কত কষ্টে আছে। কোন একজন নাইটগার্ডের জীবন কথা শোনলে বোঝা যায়, দুঃখ কারে বলে। গ্রামের দুঃস্থ, হতদরিদ্র ও কৃষিজীবী মানুষের দিকে তাকালে বোঝা যায় কষ্ট মানুষের কত আপন। কষ্ট যেন এদের নিকট কুটুম। দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে গার্মেন্টস কর্মী ও নাইটগার্ড ঠিকমত বেতন-ভাতা পায় না। বৃষ্টিতে ভিজে রোদে পুড়ে কঠোর শ্রম ও পুঁজি ব্যয় করে ফসল ফলিয়ে ন্যায্য মূল্য পায় না কৃষক। কখনও আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নিয়ে যায়। যার কারণে দুঃখ-যন্ত্রণায় ছটফট করে আর হতাশায় ধুঁকে ধুঁকে মরে কৃষক। ঋণের বোঝা পিছ ছাড়ে না। সার ওষুধের দাম কমে না। দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতির কারণে মানুষ দিশেহারা। আয় অপেক্ষা ব্যয় বেশি।  মনের কষ্ট বুকে চেপে দুখী মানুষের জীবন জেগে থাকে।
দুখী মানুষের করুণ কথা কেউ শোনতে চায় না। কথায় কথায় অনেকে বলে, দুঃখে যাদের জীবন গড়া তাদের আবার দুঃখ কিসের! দুঃস্থ, অসহায় ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরকার বিভিন্ন সহযোগিতা ও সহায়তা দেয়, কিন্তু তার বড় অংশ হর্তাকর্তাদের পেটে চলে যায়। বণ্টনে তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা একান্ত প্রয়োজন। দুর্নীতির কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। তারুণ্যের শক্তি কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
শত দুঃখ-কষ্ট ও বঞ্চনা বুকে নিয়ে মানুষ নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করে। নতুন কিছু করতে চায়। নতুন আলোয় জেগে ওঠে। পুরনো সব দুঃখ, কষ্ট, হতাশা, ব্যর্থতা, না পাওয়ার বেদনা সব কিছু তুচ্ছ করে, পেছনে ফেলে নতুন প্রত্যাশায় স্বপ্নময় জীবন জেগে থাকে। জীবন জেগে থাকে আলোর প্রত্যাশায়। অনন্ত ভালবাসায় জীবন জেগে থাকে।

লেখকঃ সাংবাদিক, কলামিস্ট, কথাসাহিত্যক, কবি, নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক। লালমোহন, ভোলা। nurulamin911@gmail.com. 01759648626.

SHARE

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here