পরিকল্পিতভাবে সবজির আবাদ করে সংসারের বাড়তি উপার্জন করছেন ৩৬০ পরিবার

0
5

রিমন সিকদার, কলাপাড়া

ঘূর্ণিঝড় আমফানসহ তিন দফা বৃষ্টিতে সবজির ক্ষেত সম্পুর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গেছে হনুফা বেগমের। তারপরও দমেননি মধ্য বয়সী উদ্যমী নারী হনুফা বেগম। বাড়ির আঙিনায় ফের সবজির ক্ষেত করেছেন। কুমড়ো, লাউ, ফুলকপি, বেগুন, টমেটোর চারাগুলো বেড়ে উঠছে। পরিচর্যা করার ফাঁকে ফাঁকে বলছিলেন হনুফা বেগম, দুই বছর আগেও উঠোনটি খালি পড়েছিল। এখন পরিকল্পিতভাবে সবজির ক্ষেত করেছেন। হাঁস-মুরগি পালন করেন। বড় ছেলে মাসুম ভাড়াটে মোটরসাইকলে চালায়, মেঝো হাবিব ট্রলি গাড়ী চালায়, সেজো রাকিবুল এসএসসি পরীক্ষার্থী ও ছোট মেয়ে জান্নাতি এ বছর অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্বামী পনু হাওলাদার বদলা-কামলার কাজ করেন। নয় জনের সংসারে বাড়ির জায়গা ছাড়া আর কিছুই নেই। উপার্জন বলতে গেলে স্বামী-সন্তানরাই ভরসা ছিল। নিজে শুধু গৃহিনীর কাজ করতেন। এখন সংসারের উপার্জনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন হনুফা বেগম। দুই বছর আগে উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশীপের দেয়া তিন হাজার টাকার অনুদানে হাঁস পালন শুরু করেন। বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ নিয়ে পাশাপাশি সবজির আবাদ করেন বাড়ির আঙিনায়। স্বচ্ছলতার মুখও দেখতে পান। ৪০টি হাঁস বিক্রি করে ছাগল পালন শুরু করেন। এখন সাতটি ছাগল হনুফার। নিজে কোনমতে সই দিতে পারেন। তবে ছোট ছেলে-মেয়েকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করবেন এমন দৃঢ়তা রয়েছে মানুষটির। এমনকি সারা বছরের আয়-ব্যয়ের হিসেব রাখতে একটি বই পর্যন্ত রয়েছে। যেখানে উৎপাদিত কলা-পেপে বিক্রির টাকা থেকে শুরু করে সবকিছু লিখে রাখেন। তেমনি ব্যয়ের খাতও পরিষ্কার বোঝা যায় বইটি দেখে। দেখালেন, গত দেড় বছরে চিকিৎস্যা ব্যয় করেছেন ২৯ হাজার ৩১৬ টাকা। ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০২০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত কৃষি-হাঁস-মুরগি পালনসহ ফল-ফলাদি বিক্রি করে তার মোট আয় ৬৮ হাজার ৫৮২ টাকা এবং ব্যয় ৬৮ হাজার ৩৮২ টাকা। নিজের আয়-ব্যয়ের হিসাবটি সংরক্ষণ করায় সহায়তা করেন ছোট আদরের মেয়ে জান্নাতি। জানালেন, হনুফা বেগম শিখেছেন হাঁস-মুরগি পালন, ভ্যাকসিনেশন। শাক-সবজির ক্ষেত করা। দূর্যোগকালীন ব্যবস্থাপনা। বাল্যবিয়ে দেয়া অপরাধ এবং সমাজের জন্য ক্ষতিকর। নিজেও দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য।
বাড়ির উঠোনে অন্তত পাঁচ কেজি ওজনের বড় সাইজের চাল কুমড়া ঝুলছে সালমা বেগমের। অন্য সবজিও রয়েছে উঠোনজুড়ে। শ্রমজীবী স্বামী শহিদুল ইসলামকে নিয়ে উঠোনে এসব চাষ করেছেন সালমা বেগম। এসব বিক্রি করে এ মৌসুমে প্রায় ১০ হাজার টাকা আয় এ দম্পতির। চার জনের সংসারে স্বাচ্ছন্দ এসেছে। কলাপাড়া উপজেলার পুনামাপাড়া গ্রামের খালের পাড়ে সালমাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, ছোট আকারের বাড়িটি শাক-সবজিতে পরিপূর্ণ। এসব উৎপাদনে সে নিজের তৈরি জৈব সার (কেঁেচা কম্পোস্ট) ব্যবহার করেন। তাই সবজির কদর রয়েছে। বাড়িতেই বেশিরভাগ বিক্রি হয়ে যায়। স্বামীর একার আয়ের টানাটানির সংসারেও যোগান দিচ্ছেন সালমা। এখানেই সে থেমে থাকেননি। হাঁসের ডিম বিক্রি করে কিনেছেন দু’টি ছাগল। নিজের উৎপাদিত কেঁচো কম্পোস্ট সার বিক্রি করেও বাড়তি আয় করছেন এই গৃহিনী।
উপক‚লের কলাপাড়ায় লবনাক্ত জমিতে সবজির চাষ হয়না এমন ধারনায় এসব জমি এতদিন পতিত ছিল। সম্প্রতি এসব পরিবারের বিশেষ করে নারী সদস্যরা বিভিন্ন ধরনের সবজির আবাদ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন, তেমনি উপার্জনও বাড়ছে। যেন পরিকল্পিতভাবে উঠোন থেকে শুরু করে বাড়ির আঙিনায় যা আছে তার সঠিক ব্যবহার করে উৎপাদনমুখি হয়েছেন এরা।
জানা গেল, এভাবে কলাপাড়া উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের ৩৬০টি দরিদ্র শ্রমজীবী পরিবারের সদস্যরা বাড়ির উঠোনে সবজি চাষের পাশাপাশি হাঁস, ছাগল পালন, কেঁচো কম্পোস্ট সার তৈরিসহ বিভিন্ন ধরনের সচেতনতামূলক কর্মকান্ডের শিখন পদ্ধতি পেয়েছেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশীপ এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক জুয়েল হাসান জানান, এসব পরিবারকে চাষাবাদের পদ্ধতিসহ বিভিন্ন ধরনের সচেতনতামূলক কর্মকান্ডের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। অতিসম্প্রতি বিভিন্ন ধরনের বীজ সংরক্ষণের জন্য প্লাস্টিক ড্রাম বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও এসিসট্যান্স ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের অধীনে এসব প্রশিক্ষিতদেরকে উন্নত জাতের সব্জি বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে। নিজেদের সংসারে বাড়তি আয়ের পাশাপাশি এসব প্রশিক্ষিত লোকজনের মনোবলও বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের ছেলে-মেয়েরা ক্ষেত-খামারে কাজ করার পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে।

SHARE

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here