ভারতের প্রথম মসজিদ চেরামনের ইতিহাসের অপূর্ব বর্ণনা দিলেন কবি প্রিয়া ইসলাম ফাতিহা

0
25

রিপন শান

মহানবী (সা:) বলেছেন- ভাবুক এমন ভ্রমণকারী দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ দরবেশ । জীবন ও সত্যকে নিয়ে নিবিড় ভাবনা এবং জগতের সকল সৌন্দর্যকে ভ্রমণের মাধ্যমে আত্মীকরণের পিয়াসা- এ দুটো মহান গুণ তীব্রভাবে রয়েছে কলকাতায় জন্মগ্রহণকারী ভারতের স্বনামখ্যাত নারীউদ্যোক্তা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কবি গবেষক প্রিয়া ইসলাম ফাতিহার । দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে যেমনি রয়েছে তাঁর সুনাম, তেমনি বেকারদের কর্মসংস্থানে, দুস্হ ও আর্তমানবতার সেবায় তাঁর ভূমিকা সব্যসাচী সমাজকর্মীর। সাম্প্রতিক সময়ে শান্তি ও মানবতার মহান ধর্ম ইসলামকে নিয়ে ব্যাপক পড়াশোনা, পর্যালোচনা ও গবেষণার নির্যাস নিপূণ জুহুরীর মতো তুলে আনছেন তাঁর লেখায় । মেধা ও প্রজ্ঞার বুননে ও বপনে বিশ্ববাঙালি মুসলিম পাঠকের চলমান সময়ধারায় একটি আদৃত নাম প্রিয়া ইসলাম ফাতিহা । চৌদ্দশ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ভারতবর্ষের প্রথম মসজিদ চেরামন জুমা মসজিদের ইতিহাস ঐতিহ্য ও কবুতর সৌন্দর্য লেখক গবেষক প্রিয়া ইসলাম ফাতিহাকে ব্যাপকভাবে অভিভূত করেছে । ভারতের কেরালা রাজ্যের কদুনগালোর তালুকে অবস্থিত চেরামন জুমা মসজিদ ভ্রমণ করে ইসলামের ইতিহাসে মহাগুরুত্বপূর্ণ এই মসজিদের বিন্দুবৃত্ত তুলে ধরেছেন প্রিয়া ইসলাম ফাতিহা :

ধারনা করা হয় বিশ্বের ২৫ লক্ষ মসজিদের ২ লক্ষ ৮০ হাজার মসজিদ ভারতে অবস্থিত । তার মধ্যে প্রথম প্রতিষ্ঠিত মসজিদ- চেরামন জুমা মসজিদ । মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবদ্দশাতেই সপ্তম শতকের প্রথম ভাগে ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে অনেকটা নীরবে-নিভৃতে ইসলাম প্রবেশ করে আরব ব্যবসায়ীদের হাত ধরে। আর সেখানে নির্মিত হয় ভারত’বর্ষের প্রথম জুমা মসজিদ। ৬২৯ সালে সাহাবী মালিক দীনার (রাঃ) ভারতের প্রথম মসজিদ চেরামন জুমা মসজিদ নির্মাণ করেন। এটি শুধু ভারতবর্ষের প্রথম মসজিদই নয়, আরব বিশ্বের বাইরে নির্মাণের দিক থেকে পৃথিবীর প্রাচীনতম মসজিদগুলোর একটি । এবং এই মসজিদের বয়স ১৪শ বছর। মসজিদটি পরাভুর-কদুনগালোর রোড, এন’এইচ ২৭, মেথালা, কদুনগালোর তালুক, কেরালা, ইন্ডিয়া- এই ঠিকানায় দেদিপ্যমান ।

ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিম আরব সাগরের উপকূলে বর্তমান কেরালা রাজ্য এক হিন্দু রাজা ছিলেন, যার নাম ছিলো চেরামন পেরুমল। কথিত আছে, একদিন তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, আকাশের চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়েগেছে। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত রাজা তার সভার বিজ্ঞজনদের কাছে তার স্বপ্নের অর্থের কথা জানতে চাইলে, কেউ তার সদুত্তর দিতে পারেনি, তাই রাজার মনে অস্বস্তি থেকেই যায়। তৎকালীন সময় ভারতের সাথে আরবদের ব্যবসায়িক সুসম্পর্ক ছিলো। আরব দেশীয় বণিকরা সমুদ্রেপথে ভারতে এসে বানিজ্য করতো। রাজার স্বপ্নের কিছুদিন পরেই একদল আরব মুসলমান বণিক, রাজা চেরামনের সমুদ্র বন্দরে এসে পৌছায়। তখন দিকে দিকে ইসলামের জয় জয়কার এবং বণিকদের কাছ থেকে ইসলাম ধর্ম এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) প্রশংসা রাজ্যে ছড়িয়ে পরতে থাকে। একসময় মুহাম্মাদ (সাঃ) এর আঙুলের ইশারায় চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হবার কাহিনীও রাজার কানে এসে পৌছায়। অতপর রাজা বণিকদের ডেকে তাদের কাছ থেকে মুহাম্মাদ (সাঃ) এর কথা শোনেন, এবং বুঝতে পারেন যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) যে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করেছিলেন, রাজা স্বপ্নে তারই ইঙ্গিত পেয়েছেন। রাজা তখনই বণিকদের কাছে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তাদের সাথে মক্কার উদ্দেশ্য যাত্রা করেন। ইতিহাস বলে রাজা চেরামন, মহানবী মুহাম্মাদ (সাঃ) এর সাথেও দেখা করেন এবং ‘তাজউদ্দীন’ নাম গ্রহণ করেন। রাজা চেরামন ওরফে তাজউদ্দিন মক্কা থেকে ভারত আসার যাত্রা পথে ওমানে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যর আগে রাজা আরবদের তার দেশে ইসলাম প্রচারের জন্য অনুরোধ করেন এবং তাদের হাতে তার রাজ্যের সভাসদদের উদ্দেশ্যে তার লেখা একটি চিঠি তুলে দেন। সেই চিঠিতে তিনি রাজ্যে একটি মাসজিদ নির্মাণের কথা ব্যক্ত করেন। বণিকদল রাজার চিঠি নিয়ে আবার কেরালায় আসেন এবং রাজার ইচ্ছা অনুযায়ী রাজার নামে ৬২৯ সালে নির্মাণ করেন চেরামন জুমা মাসজিদ। বলাবাহুল্য, মালিক ইবনে দিনার নামে যার কথা ইতিহাস বলে তিনি ছিলেন হাসান বসরি (রা) উনার ছাত্র কিন্তু তিনি কখনো ভারতবর্ষে আসেননি। আবার এখানে ইতিহাসবিদ বাহাদুর পি গোপালানের বর্ননা অনুযায়ী মালিক ইবনে দিনার নয়, বরং মালিক দীনার এসেছিলেন, যিনি মাহাম্মাদ (সাঃ) উনার সাহাবী ছিলেন এবং মালিক দীনারের জীবদ্দশায় তিন বার ভারত সফরে আসার উল্লেখ আছে। তিনি প্রথমবার ভারতে আসেন তার চাচাতো ভাই মানিক ইবনে হাবীবের সাথে । মালিক ইবনে হাবীব মুহাম্মাদ (সাঃ) এর চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করা প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। রাজা চেরামন যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন মালিক দীনার সাথে ছিলেন। দ্বিতীয়বার মালিক দীনার আসেন রাজা চেরামনের ইন্তেকালের পর রাজার চিঠি নিয়ে এবং তখন তিনি চেরামন জুমা মসজিদসহ আরো কয়টি মসজিদ নির্মাণ করেন । শেষ বয়সে মালিক দিনার ভারত আসার পথে ইন্তেকাল করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here