বরিশালে বাল্যবিয়ের ধুম, প্রশাসন ব্যস্ত করোনা প্রতিরোধে

0
10

দ্বীপকন্ঠ নিউজ ডেস্কঃ

কনের নাম মর্জিনা আক্তার। বয়স ১৩ পার হয়েছে সবেমাত্র। করেনার প্রার্দুভাবে হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেছে স্কুল। স্কুল ব্যাগেরও খোঁজ রাখা হয়নি অনেক দিন। বাইরে বের হতে বারণ। কর্পোরেশনের লোকজন মাইকে ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছেন স্বাস্থ্য সচেতনতার। সুতরাং খুব একটা বাইরে বের হন না বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এলাকার ১০ নং ওয়ার্ডের ভাটার খাল বস্তির মেয়ে মর্জিনা। বাইরে যেতে যখন মানা, তখন টিভি সিরিয়াল দেখেই সময় কাটে।

কিন্তু তার মাঝে একদিন জানতে পারলো তাকে দেখতে আসছে বরপক্ষ। মর্জিনার বিয়ের বয়স হয়নি। তাই অতসব বোঝেও না সে। কিন্তু সত্যি তার বিয়ে হয়ে গেলো এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে। এখন মর্জিনার ঠিকানা ২০ বছর বয়সী ড্রাইভার স্বামীর ঘরে। ওই মাসের শেষের দিকে ভাটারখালে জানা গেলো আরও একটি বিয়ের আয়োজন। মর্জিনা তাকে চিনতো। খুব দোস্তি ছিল। সোনিয়া নামের সেই মেয়েটি বিয়ের থেকে বাঁচতে অনেক কান্নাকাটি করেছে। কিন্তু মা-বাবার বকুনিতে সব সহ্য করতে হয়েছে। শেষে ২৪ বছর বয়সী যুবকের হাত ধরে পিতার ঘর ছাড়ে সোনিয়া। ভাটার খালের পশ্চিমে আব্দুর রাজ্জাক কলোনী।

স্থানীয় যুবক ধুমধাম করে ঘরে তুললেন দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীকে মৌখিক তালাক দিয়ে স্থানীয় প্রভাবে তাড়িয়ে দিয়ে দ্বিতীয় যে স্ত্রীকে ঘরে তুলেছেন তাও অপ্রাপ্ত বয়স্ক। স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, বিগত দেড় মাসে ৮টি বাল্য বিয়ে হয়েছে এই বস্তিতে।
বৈশ্বিক মহামারি কভিড-১৯ প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন যখন ব্যস্ত মানুষকে সচেতন করতে, মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিতে আর করোনা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে ঠিক তখন প্রান্তিক পর্যায়ে ধুম লেগেছে বিয়ের। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিয়ম কানুনের বালাই না করেই বাল্য বিয়ের হচ্ছে বরিশাল নগরীর বস্তি এলাকাগুলোয়।

খোঁজ-খবর নিয়ে জানা গেছে, ভাটার খাল, কেডিসি বস্তি, বালুর মাঠ, হিরন নগর, রসুলপুর, আমানতগঞ্জ এলাকায় প্রায়ই ঘরোয়া আয়োজনে বাল্য বিয়ে হচ্ছে।

‘করোনায় কারও বয়স আটকে থাকছে না। সুতরাং বিয়েও আটকে রাখার দরকার কি! জন্ম যখন হয়েছে, বিয়ে একদিন হবেই। একটু আগে হলে সমস্যা নেই। আর করোনার সময় বিয়ে দিলে কম খরচে অনুষ্ঠান তোলা যায়।’ এমন দাবী মর্জিনার পিতা আনোয়ারের। মর্জিনার বান্ধবী সোনীয়ার পিতা আহম্মেদ আলী জানান, করোনায় নিজের সংসার চলে না। বিয়ে দিয়েছি; এখন মেয়ের দায়িত্ব তার স্বামীর। এমন আরও অজুহাত দেখান দুই অভিভাবক।

ওয়ার্ল্ড ভিশনের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বর্তমানে বাল্যবিয়ের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আর বাল্যবিয়ে বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া। তাছাড়া লকডাউনের কারণে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে রোধের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে সংস্থাগুলোর জন্য। পাশাপাশি মহামারিতে অল্পবয়সী মেয়েদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার সুযোগলাভের বিষয়টি আরও কঠিন করে তুলছে। ফলে কিশোরী বয়সে গর্ভধারণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে মেয়ে শিশুদের ওপর বিয়ের চাপ বাড়ছে।এ সম্পর্কে জানতে চাইলে মবিলাইজেশন ফর অল্টারনেটিভ প্রগ্রোমের (ম্যাপ) নির্বাহী পরিচালক শুভংকর চক্রবর্তী জানান, সুযোগ সন্ধানীরা বাল্য বিয়ের জন্য করোনাসংকটের সুযোগটাকেই কাজে লাগাচ্ছেন। বাল্য বিয়ে মানেই একটি জাতি ধংসের জন্য যথেষ্ঠ।তিনি মনে করেন, বাল্যবিয়ে রোধে বরিশালবাসীর অন্তত এখন জরুরী ভিত্তিতে এগিয়ে আসা উচিত।

এছাড়া সরকারের দায়িত্বশীলরা যে শুধু করোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন আর বাল্য বিয়ে রোধে নজর দিবেন না সে কথাটা অযৌক্তিক। এই সময়ে বাল্যবিয়ে হতে থাকলে তা সমাজের বিপর্যয় ডেকে আনবে।এই সংগঠক মনে করেন, করেনা রোধে কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি বাল্যবিয়ের মত অপরাধ দমনে কঠোর হস্থে আইন প্রয়োগ করা উচিত।বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সভাপতি কাজল ঘোষ বলেন, এই সময়ে বাল্য বিয়ে অশনি সংকেত। তা কোনভাবেই গ্রহনযোগ্য না। সরকারের আদেশ অনুসারে বাল্য বিয়ে সম্পূর্ন বেআইনী। একজন সচেতন মানুষ হিসেবে আমি এটা কোন ভাবেই গ্রহন করতে পারি না। আমরা আবেদন জানাব প্রশাসনের কাছে এ বিষয়ে জরুরী ভিত্তিতে ব্যবস্থা করার।বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের ১০ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর এটিএম শহিদুল্লাহ কবির জানান, ভাটার খাল এলাকায় বাল্য বিবাহের বিষয়ে আমার জানা নেই।

তাছাড়া, বাল্য বিয়ে হলে মানুষ তা চেপে রাখে। মানুষ নিজেরা নিজেদের ক্ষতি করে। কিন্তু তা বুঝতে পারে না। এই জনপ্রতিনিধি বলেন, যারা বাল্য বিয়ে দিয়েছেন বা দিচ্ছেন তারা আমার কাউন্সিলর অফিস থেকে জন্মনিবন্ধনের কাগজও সংগ্রহ করেন না। কোর্ট এলাকা ও বিবির পুকুরপাড় এলাকায় কম্পিউটারের দোকান থেকে ভূয়া জন্মনিবন্ধনের কাগজ তৈরী করে এই অপরাধ করে যাচ্ছেন। আমি নিজে এ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করছি। তাছাড়া বাল্য বিয়ের খবর পেলে আমি প্রশাসনকে খবর দিয়ে তা বন্ধ করার ব্যবস্থা করি।বরিশাল কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুল ইসলাম বলেন, কোন মারফত আমাদের কাছে বাল্য বিয়ের খবর আসলে আমরা সাথে সাথে তা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।

SHARE

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here