মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল কদরের তাৎপর্য

0
59

জিল্লুর রহমান

লাইলাতুল কদর মহিমান্বিত একটি রজনী। লাইলাতুল কদরের অন্য নাম শবে কদর। ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘কদর’ অর্থ মর্যাদাপূর্ণ, মহিমান্বিত, সম্মানিত। আর লাইলাতুল কদরের অর্থ সম্মানিত বা মহিমান্বিত রাত। রমযানের এই রাতটি আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের কাছে সর্বাপেক্ষা মর্যাদাপূর্ণ এবং প্রিয় রজনী। উম্মতে মোহাম্মদী (সা.) এর নিকট এটি আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে বিশেষ উপঢৌকন এ মহিমান্বিত রজনী হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলে আল কোরআনে ঘোষিত হয়েছে। কদরের রাতে অজস্র ধারায় আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়। এ রাতে এত অধিকসংখ্যক রহমতের ফেরেশতা পৃথিবীতে অবতরণ করেন যে, সকাল না হওয়া পর্যন্ত এক অনন্য শান্তি বিরাজ করে পৃথিবীতে।
মুসলিম সমাজ রমযানের রোজা রাখার মাধ্যমে এ রাতের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। তাই ইসলামে লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব অপরিসীম। রোজাদার মুসলমানা এ রাতকে পেয়ে নিজেকে একজন আল্লাহর বান্দাতে পরিগণিত হওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকেন। আল কোরআনে লাইলাতুল কদরের অনন্য মর্যাদায় একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা আল কদর রয়েছে। এ সূরা থেকে এর গুরুত্ব অনুভব করা যায়। এ রাতে কালামে রব্বানী লাউহে মাহফুজ থেকে পৃথিবীতে নাজিল হয়। এজন্য এরাত হাজার মাস (৮৩ বছর ৪ মাস) অপেক্ষা উত্তম। এ রাতে জিবরাইল (আ.) এর নেতৃত্বে ফেরেশতাদের একটি দল ধূলির ধরায় অবতরণ করেন।
রমযান আরবি হিজরি সনের মাসগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ মাস। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, এই মাসেই নাজিল হয়েছে মানবজাতির হেদায়েতের বিধান আল কোরআন। এরশাদ হয়েছে, “রমযান সে-ই মাস যাতে নাজিল হয়েছে আল কোরআন, যা মানুষের জন্য দিশারী এবং সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য-মিথ্যার মানদন্ড” (সূরা বাকারা-১৮৫)। শুধু আল কোরআন নয়, রাসূল (সা.) বলেছেন, “দুনিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মহান আল্লাহপাক পয়গম্বরদের প্রতি যত কিতাব নাজিল করেছেন তা সবই রমযান মাসেই নাজিল করেছেন।” আরো এরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই আমি এই (গ্রন্থ) টিকে নাজিল করেছি এক মর্যাদাপূর্ণ রাতে। তুমি কি জান সেই মর্যাদাপূর্ণ রাত কি? এই মর্যাদাপূর্ণ রাতটি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম” (সূরা আল কদরঃ ১-৩)।
পবিত্র কোরআন এই মাসে নাজিল হওয়ার কারণে মাহে রমযানের এত মর্যাদা ও সম্মান। আল কোরআন আল্লাহর দেয়া সর্বশ্রেষ্ঠ রহমত ও নেয়ামত। এরশাদ হয়েছে, “এই কোরআন অসীম দয়াময় আল্লাহ শিখিয়েছেন” (সূরা আর রাহমান-১০২)। হযরত জিবরাইল (আ.) রমযান মাসের প্রতি রাতে রাসূল (সা.) কে কোরআন শিক্ষা দিতেন (বুখারি ও মুসলিম)। হযরত ফাতেমা (রা.) এর অপর বর্ণনায় এসেছে, হযরত জিবরাইল (আ.) প্রতি বছর রমযান মাসে একবার রাসূল (সা.) এর নিকট কোরআন আবৃত্তি করতেন। কিন্তু তাঁর ওফাতের বছর দু’বার রাসূল (সা.) এর নিকট কোরআন পেশ করেন। কাজেই কোরআনের বদৌলতেই রমযানের মর্যাদা। রমযান মাসের লাইলাতুল কদরেই কোরআন নাজিল হয়েছে বলে আল কোরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা।
রাসূল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি এ রাতে ঈমান ও সওয়াবের নিয়তে ইবাদতের জন্য দাঁড়াবে তার অতীতের সকল গুনাহ ক্ষমা করা হবে” (বুখারি)। অন্য হাদিসে আছে, “রাসূল (সা.) বলেছেন, “তোমাদের কাছে রমযান মাস এসেছে। এ মাসের মধ্যে এমন একটি রাত আছে, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাত থেকে বঞ্চিত হবে, সে সমগ্র কল্যাণ ও বরকত থেকে বঞ্চিত হবে। এর কল্যাণ থেকে একমাত্র হতভাগ্য ছাড়া আর কেউ বঞ্চিত হয় না” (ইবনে মাযা)। অন্য এক হাদিসে আছে, হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসূল (সা.) বলেন, “কদর রাতে হযরত জিবরাইল (আ.) একদল ফেরেশতা নিয়ে দুনিয়ায় অবতরণ করেন। তারা সকল লোকের জন্য দু’আ করে থাকেন, যারা এ রাতে দাঁড়ানো বা বসা অবস্থায় ইবাদতে লিপ্ত থাকেন” (বায়হাকী)।
লাইলাতুল কদরকে “লাইলাতুল হাকাম বা সিদ্ধান্তের এবং লাইলাতুল তাকদীর বা ভাগ্য নির্ধারণের রাতও বলা হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণিত হাদিস থেকে জানা যায়, লাইলাতুল কদরে মানুষের জীবনকাল, মৃত্যু, রিজিক এবং বৃষ্টিপাত ইত্যাদির মাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়। এমনকি পরবর্তী হজের সময় হাজিদের সংখ্যা ইত্যাদি সম্পর্কিত সিদ্ধান্তের ছায়া লিপি ফেরেশতাদেরকে প্রদান করা হয়। তাকদীরের সিদ্ধান্ত লাইলাতুল কদরে কার্যকরের দায়িত্ব ফেরেশতাদের উপর অর্পিত হয়” (তাফসীরে রুহুল মা’আনী)।
লাইলাতুল কদরের নির্দিষ্ট কোনও তারিখ নেই। অনেকেই মনে করেন ২৭ রমযানই লাইলাতুল কদরের রাত। আসলে এ ধারণাটি মোটেও সঠিক নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনও বলেন নি যে, ২৭ রমযানের রাত কদরের রাত। তবে ২১ রমযান থেকে নিয়ে ২৯ রমজন পর্যন্ত বেজোড় যে কোন রাতই শবে কদর হতে পারে। লাইলাতুল কদরের তারিখের ব্যাপারে নবী করীম (সা.) এরশাদ করেন, আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়েছে, অতঃপর আমাকে তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। অতএব তোমরা শেষ দশ রাতের বেজোড় রাতসমুহে তা খোঁজ করবে। (বুখারি, হাদিস নং :৭০৯)। রাসূল (সা.) আরও বলেন, ‘রমযানের শেষ দশদিনে তোমরা কদরের রাত তালাশ কর’ (মুসলিম, হাদিস নং: ১১৬৯)। একদা হজরত উবায়দা (রা.) নবী করীম (সা.) কে লাইলাতুল কদরের রাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তখন নবীজী সেই সাহাবিকে বললেন রমযানের বেজোড় শেষের দশ দিনের রাতগুলোকে তালাশ করো। (বুখারি, হাদিস নং: ২০১৭)।
হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যদি কেউ লাইলাতুল কদর খুঁজতে চায় তবে সে যেন তা রমজনের শেষ দশ রাত্রিতে খোঁজ করে। (মুসলিম, হাদিস নং : ৮২৩)। তাই ২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯ রমযানের রাতগুলোকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সুতরাং এই আলোচনা থেকে বুঝা যায় যে, কদর রাত্রির সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে এবং নির্দিষ্ট তারিখ না হওয়ার পেছনে আল্লাহ তায়ালার রহমত ও বরকত রয়েছে। ওলামায়ে কেরাম বলেন, এর ফলে মানুষের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর তালাশের স্পৃহা বৃদ্ধি পাবে এবং মুসলমানগণও বেশি বেশি ইবাদত করতে পারবেন।
এ রাতে মু’মিন ব্যক্তি যে নেক আমল করে তা আল্লাহর নিকট গৃহীত হওয়ার কারণে সে সর্বাধিক মর্যাদার অধিকারী হয় বলে এ রাতের নাম দেয়া হয়েছে লাইলাতুল কদর। হাজার মাসের তুলনায় এ রাত উত্তম হওয়ায় এ রাতের নাম লাইলাতুল কদর হওয়া যুক্তিযুক্ত। সবচেয়ে মর্যাদাশীল কিতাব মহাগ্রন্থ আল্ কোরআন এ রাতে অবতীর্ণ হওয়ায় এ রাত কদর বা অতি মর্যাদার রাতরূপে অভিহিত হতে পারে। হযরত সাহল ইবনে আবদুল্লাহর মতে, “আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তাঁর বান্দাদের প্রতি রহমত বর্ষণের পরিমাণ এ রাতে নির্ধারণ করেন বলে এ রাতের নামকরণ করা হয়েছে লাইলাতুল কদর বা নির্ধারণী রজনী।
রাসূল বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে আখেরাতে মুক্তির আশায় কদরের রাতের ইবাদত করবে আল্লাহ তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন” (বুখারি)। রাসূল (সা.) নিজের পরিবার বর্গকে রাতে ইবাদতের উদ্দেশ্যে জাগিয়ে দিতেন এবং সাহাবারাও তা ইত্তেবা করতেন। তাই আমাদেরও উচিত রাসূল (সা.)-এর যথাযথ অনুসরণের মাধ্যমে কোরআন নাজিলের এই মাসে বেশি বেশি কোরআন পাঠ, দান-সদকা, যিকির-আযকার এবং নফল ইবাদত করা। হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, “আমি একদা রাসূল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আমি যদি লাইলাতুল কদর পাই তখন কি দোয়া করব? তিনি বললেন, “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নী।’’ অর্থাৎ হে আল্লাহ! তুমি মহীয়ান, ক্ষমাশীল। ক্ষমা করতেই তুমি ভালবাসো, আমাকে ক্ষমা কর। আসুন আমরা সবাই এই মহান রাতকে কাজে লাগিয়ে ইবাদত বন্দেগী করে, আল্লাহর দরবারে তওবা করে অতীতের কৃত গুনাহ থেকে ক্ষমা চেয়ে জীবনকে পুত-পবিত্র করে তুলি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here