লালমোহনে নৌকা তৈরি করে জীবিকা যোগাচ্ছে শতাধিক শ্রমিক

0
54

সাব্বির আলম বাবু, লালমোহন

ভোলার লালমোহনে নৌকা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন শতাধিক শ্রমিক। এদের পুরো পরিবারই বংশানুক্রমে এ পেশার সাথে জড়িত। উপজেলার গজারিয়া বাজারে প্রতিদিন নৌকার হাটে বেঁচা-কেনা হয় শ্রমিকদের বানানো এইসব নৌকা। নদী মাতৃক বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় পুরোটাই নদী দিয়ে ঘেরা। প্রবাহিত নদীর পলি বিধৌত এই এলাকা মুলত একটি ব-দ্বীপ। এখানের মাটি যেমন উর্বর, তেমনি নদ-নদী গুলোতে রকমারি মাছের মহাসমারোহ। মেঘনা, তেঁতুলিয়ায় ঘেরা চারিদিকে পানি বেষ্টিত বিধায় এখানে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা জেলে স¤প্রদায়ের সংখ্যাই বেশী। এ কারণে বর্ষার মৌসুমের শুরুতেই জেলেদের প্রধান বাহন নৌকা তৈরীতে ধুম লেগে যায়। লালমোহন গজারিয়া পূর্ব বাজারে রাস্তার পাশে নৌকা তৈরীর মিস্ত্রীদের বানানো সারি সারি সাজিয়ে রাখা নৌকা দেখলে মনে হয় নৌকার হাট বসেছে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই ব্যাবসা এলাকাবাসীর কাছে একটি অন্যতম ঐতিহ্য। নয়নাভিরাম নৌকার পসরা চোখে না দেখলে মনেই হবে না জলে-ডাঙ্গায় এক সঙ্গে এত নৌকার সমারোহ থাকতে পারে। এখানকার প্রায় শতাধিক পরিবার কয়েক যুগ ধরে বংশ পরম্পরায় নৌকা-বৈঠা তৈরী ও বিক্রি করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার নদ-নদীর উপকূলীয় এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে এই নৌকার সাম্রাজ্য। উপজেলার গজারিয়া বাজারের নৌকা তৈরীর কারিগর জ্যোতিষ জানান, বংশানুক্রমিক তিনি এ পেশার সাথে জড়িত। বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা নৌকার হাটে এসে নৌকা কিনে। অনেকে আবার শুধু নৌকার নয়নাভিরাম সৌন্দর্য দেখার জন্য দুর-দুরান্ত থেকে ছুটে আসে। এক সময় তার এসব নৌকা তৈরী করতে সুন্দরী কাঠ ব্যবহার করতেন, কিন্তু বর্তমানে তারা রেইন-ট্রি, মেহগনি, আম, আমড়াসহ বিভিন্ন কাঠ দিয়ে নৌকা তৈরী করেন। প্রকার ভেদে ৮০০ থেকে ২৫০০ টাকা পর্যন্ত নৌকা বিক্রি হয়। তবে এ উপকূলীয় অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা যেহেতু নৌকায় করে খাল অথবা নদীতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও যাতায়াত করে সেহেতু এখানে ডিঙ্গি নৌকার চাহিদা বেশী। আরেক মিস্ত্রী নারায়ন জানান, ১৮ হাত লম্বা কোন নৌকা তৈরীতে ৮ জন মিস্ত্রী লাগে, এর দাম হয় ১৫ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা, এই মিস্ত্রীদের দৈনিক হাজিরা ১৫০ টাকা। আর ছোট একটি নৌকা তৈরী করতে দুজন মিস্ত্রীর সময় লাগে তিন দিন এবং এটি বিক্রি করে লাভ হয় ৮/৯ শ টাকা। তবে এ সকল নৌকা তৈরীর কারখানায় লম্বা সর্বোচ্চ ২৮ হাত নৌকা তৈরী হয়। যার মূল্য প্রায় লক্ষাধিক টাকা। অপর দিকে যদি কোন নৌকায় গাব, আলকাতরা ও আলপনার কারুকাজ থাকে সে নৌকার মূল্য অনেক বেড়ে যায়। নৌকা বিক্রির সময় সাথে বৈঠা দেয়া হয় না। এটি আলাদা কিনতে হয়। এর মূল্য ১৫০/২০০ টাকা। হানিফ, কালাম, মিলন, মন্নান, সুনু, নাগরের মতো অনেক বেপারীরা এসব নৌকার কেনা বেচার সাথে জড়িত। জৈষ্ঠ্য থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত নৌকার বেচাকেনা বেশী হয়। কিন্তু কাঠ সংকট, অন্যান্য কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও গ্রামাঞ্চলে বর্তমানে এর ব্যবহার কমে যাওয়ায় ভালো ব্যবসা করতে পারছেননা নৌকা তৈরীর কারিগররা। এ অঞ্চলের নৌকা ব্যবসায়ীদের দাবী তাদের যুগ যুগ ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী নৌকার হাট সমৃদ্ধ করার জন্য সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগ নেয়া হোক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here