পটুয়াখালী প্রতিনিধি
তালাকের পরও সাবেক স্বামীর হুমকি ও হয়রানি থেকে রেহাই পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন পটুয়াখালীর দুমকির এক নারী। প্রাণনাশের আশঙ্কায় বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, মুরাদিয়া ইউনিয়ন বিএনপির মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক কবির শরিফ তাঁকে প্রায় চার মাস আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেছেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দিয়েছেন। এ ঘটনায় সাইবার আদালতের নির্দেশে থানায় মামলা হলেও আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় এবং তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আপসের চাপ দেওয়ার অভিযোগ তুলে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দ্বারস্থ হয়েছেন ওই নারী।
ভুক্তভোগী লিমার অভিযোগ, ২০২১ সালের ১৯ আগস্ট বরিশালে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে কবির শরিফের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের প্রায় এক বছর পর তিনি জানতে পারেন, কবিরের আগের দুই স্ত্রী ও সন্তান রয়েছে। এ নিয়ে দাম্পত্য কলহ শুরু হলে তাঁকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
লিমার দাবি, একপর্যায়ে কবির তাঁকে বরিশাল থেকে দুমকির বোর্ড অফিস বাজার এলাকায় নিজের মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় একটি কক্ষে নিয়ে প্রায় চার মাস আটকে রাখেন। কক্ষের বাইরে তালা দিয়ে তাঁকে নির্যাতন করা হতো। অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার কথা বলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। পরে গত ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ কাজি অফিসের মাধ্যমে কবিরকে তালাকের নোটিশ পাঠান।
এরপর থেকেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ লিমার। তাঁর ভাষ্য, তালাকের পর কবির তাঁর বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও আদালতে মামলা করেন। পাশাপাশি তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও ভয়ভীতি ও হত্যার হুমকি দেওয়া শুরু করেন। জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে মা-বাবাকে সঙ্গে নিয়ে দুমকি থানায় গেলেও তাঁর অভিযোগ বা জিডি গ্রহণ করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
লিমা আরও অভিযোগ করেন, নিরাপত্তার জন্য বারবার মোবাইল ফোনের সিম পরিবর্তন করেও রেহাই পাননি। প্রতিবারই তাঁর নতুন নম্বরের অবস্থান শনাক্ত করে তাঁকে হুমকি দেওয়া হতো। এ কাজে থানা পুলিশের সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ তাঁর। একপর্যায়ে নিরাপত্তার স্বার্থে মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধ করে দেন তিনি।
এদিকে, কবির শরিফ নিজের ফেসবুক আইডিসহ একাধিক আইডি থেকে লিমার ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও আপত্তিকর মন্তব্যসহ প্রকাশ করতে থাকেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে পরিচিতজনদের মোবাইল ফোনে সেসব ছবি ও ভিডিও দেখে সাইবার আদালতের দ্বারস্থ হন লিমা। আদালতের নির্দেশে দুমকি থানায় সাইবার আইনে মামলা নেওয়া হয়। মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পান উপপরিদর্শক (এসআই) সজিব।
তবে লিমার অভিযোগ, তদন্ত কর্মকর্তা আসামিকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ না নিয়ে তাঁকে থানার ওসির কক্ষে বসিয়ে মামলা প্রত্যাহার ও আসামির সঙ্গে আপস-মীমাংসার জন্য চাপ দিয়েছেন। একই সঙ্গে কবিরের লোকজন তাঁর বাড়িতে গিয়ে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি দিচ্ছেন।
গত ১৯ অক্টোবর মা-বাবাকে সঙ্গে নিয়ে পটুয়াখালী পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে যান লিমা। পুলিশ সুপারকে না পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের কাছে মৌখিকভাবে বিস্তারিত অভিযোগ জানান। পরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দুমকি থানার ওসিকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন বলে জানান তিনি।
এরপরও নিরাপত্তাহীনতা কাটেনি বলে অভিযোগ লিমার। গত ২৪ অক্টোবর মা-কে সঙ্গে নিয়ে বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজির কাছে লিখিত আবেদন করেন তিনি। ডিআইজি তাঁকে আশ্বস্ত করলেও এখনো ভয়ে বাড়িতে থাকতে পারছেন না বলে দাবি করেন ওই নারী।
তবে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দুমকি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সেলিম উদ্দিন। তিনি বলেন, তদন্ত কর্মকর্তার সামনে বাদীকে মামলা তুলে নিতে বা আপস-মীমাংসা করতে চাপ দেওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি। আসামি গ্রেপ্তারে পুলিশের উদাসীনতার অভিযোগও সত্য নয়। তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য একাধিকবার বাড়িতে অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু সেখানে তাঁকে পাওয়া যায়নি। আসামি গ্রেপ্তারে পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে কবির শরিফের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। হোয়াটসঅ্যাপে কল ও খুদে বার্তা পাঠিয়েও তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
লিমার দাবি, তিনি এখন নিজের জীবনের নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ন্যায়বিচার চান। অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত ও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিরাপদে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার নিশ্চয়তা চান তিনি।