
রুবেল আশরাফুল, চরফ্যাসন
মিথ্যা ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এমএলএসএস (পিয়ন) পদে চাকরি করছেন মো. ফিরোজ নামের এক কর্মচারি। ভোলা জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হয়েও ভূয়া কাগজপত্র তৈরির মাধ্যমে ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা দেখিয়ে তিনি এ পদে চাকরি নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ ব্যাপারে প্রধান উপদেষ্টা, জনপ্রশাসন সচিব, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার, ঢাকা জেলা প্রশাসক ও দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন এক আইনজীবী। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নজরে আসলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
এ বিষয়ে সাবেক জেলা প্রশাসক তানভীর আহমেদ তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য নির্দেশ দেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আব্দুল ওয়ারেছ আনসারীকে।
অ্যাড. নুরে আলম নোমান সালমান লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, ২০১৬ সালে ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে এমএলএসএস পদে লোক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। শুধুমাত্র ঢাকা জেলার বাসিন্দাদের কাছ থেকে এ পদে আবেদনপত্র আহ্বান করা হয়। অথচ মো. ফিরোজ ভিন্ন জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হয়েও মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে স্থায়ী ঠিকানা গোপন করে অবৈধভাবে নিয়োগ নেন। সেই থেকে ফিরোজ অদ্যাবধি ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে পিয়ন পদে বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন।
মো. ফিরোজ মূলত ভোলার চরফ্যাসন উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা। তার পিতার নাম মো. ইউছুপ, মায়ের নাম ময়ফুল। স্থায়ী ঠিকানা গ্রাম আমিনাবাদ, ওয়ার্ড নং ৯, ডাকঘর আমিনাবাদ, উপজেলা চরফ্যাসন, জেলা ভোলা। শুধু তা-ই নয় তার বাপ-দাদার স্থায়ী ঠিকানাও ভোলার চরফ্যাসনে।
ফিরোজের মা মৃত্যুবরণ করেন ২০০৯ সালে এবং বাবার মৃত্যু হয় ২০১০ সালে। ফিরোজের আপন ৩ ভাই ও ২ বোন। ফিরোজের মায়ের আগের স্বামীর ঘরের ১ ছেলে ও ১ মেয়ে সন্তান হিসেবে তার সৎ আরো ২ ভাই বোন রয়েছে। তারা সবাই ভোলার চরফ্যাসন ও তজুমদ্দিনের স্থায়ী বাসিন্দা। এমন কি তার বাপ-দাদাও ছিলেন চরফ্যাসনের স্থায়ী বাসিন্দা। ফিরোজ বর্তমানে তার গ্রামের কালিমোল্লা জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি দায়িত্বে রয়েছেন।
ফিরোজ ২০০৪ সালে চরফ্যাসনের আমিনাবাদ হাকিমিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল, ২০০৬ সালে চরফ্যাসনের আমিনাবাদের কুইচ্চামারা ফাজিল মাদ্রাসা থেকে আলিম পাস করেন।
ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশনে ফিরোজ ভোলা জেলার বাসিন্দা হওয়ার কারণে প্রথমে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দেয়নি। পরে তিনি ঢাকার মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক অহিদ উল্লাহকে ভূয়া মামা পরিচয় দিয়ে ও তার পালক সন্তান দেখিয়ে মোটা অংকের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে আবার কাগজপত্র জমা দেন। এভাবে প্রতারণার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত করে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এমএলএসএস পদে চাকরিতে নিয়োগ লাভ করেন। এর আগে ২০১০ সালে ফিরোজের বাবার মৃত্যুর পর ভোলা থেকে এসে ঢাকার কাওরান বাজারে একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে পিয়ন পদে চাকরি নেন।
এ পদের চাকরিতে দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর ধরে বহাল তবিয়তে থাকাকালীন তার নানা পরিবর্তন লক্ষ্যনীয় হয়ে ওঠে। সামান্য এমএলএসএস পদে চাকরিতে তার বেতনের আয়ের সাথে ব্যয়ের কোন সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায় না। কোটি টাকা ব্যায়ে জমি ক্রয় ও ইমারত নির্মাণ নিয়ে তাই নানা প্রশ্ন ওঠে।
ইতোমধ্যে তিনি ঢাকার কেরানীগঞ্জে ৫ কাঠা জমি ক্রয় করে বাড়ি নির্মাণসহ চরফ্যাসন পৌর এলাকায় উচ্চমূল্যে ৬ কাঠা দামী জমি কিনে ইমারত নির্মান করেছেন বলেও অভিযোগে বলা হয়েছে।
ফিরোজের নামে চরফ্যাসন উপজেলার ৫ নং আমিনাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নাগরিক সনদের কপিও রয়েছে। যা তিনি ঢাকা আইনজীবী সহকারি (মুহরি) সমিতির সদস্য হওয়ার সময় বিগত ২০১১ সালের ২৫ জানুয়ারি আবেদনপত্রের সঙ্গে দাখিল করেন। যার সদস্য নং ১৩৯৫।
ফিরোজ তার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে এলাকাবাসীর কাছে ‘ম্যাজিস্ট্রেট’ হিসাবেও পরিচয় দিয়ে থাকেন। তার এসব প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড ও মিথ্যা-জালজালিয়াতির তথ্য দিয়ে চাকরিতে বহাল থাকায় রাষ্ট্রের সাথে প্রতারণা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগে তুলে ধরা হয়েছে। যা ফৌজদারি অপরাধের শামিল বলে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করা হয়।
অভিযোগকারী জানান, ২০২৩ সালের মার্চে এবং ২০২৪ সালের অক্টোবরে জেলা প্রশাসক বরাবরে এ বিষয়ে অভিযোগ দিলেও অজ্ঞাত কারনে তদন্ত হয়নি। পরবর্তীতে গত ১৪ অক্টোবর অভিযোগকারী নিজেই সাবেক জেলা প্রশাসক তানভীর আহমেদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করে লিখিত অভিযোগ দেন। এসময় জেলা প্রশাসক এডিসিকে (সার্বিক) অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আব্দুল ওয়ারেছ আনসারীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এ বিষয়ে এডিসি (রাজস্ব) তদন্ত করছেন এবং অভিযুক্ত এমএলএসএস ফিরোজকে জবাব দাখিলের জন্য নোটিশ করা হয়েছে।
অভিযোগ সম্পর্কে জানতে ঢাকা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, অভিযোগ পেয়েছি। ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (সার্বিক) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।